শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

সদকা -কুরবানী-আকীকা




সুরা আনয়ামে যে আট ধরনের জোড় বাধা পশুর কথা বলা হয়েছে,  উপরোক্ত তিন কাজে শুধু এই সব পশুই চলবে। এছাড়া অন্য কোন ধরনের সদকা, কুরবানী বা আকীকার কথা হজরত () থেকে বর্ণিত হয় নি। কুরয়ানের চার আয়াত থেকে তা নেয়া হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা সুরা মায়িদায় বলেছেন, "اُحِلَّتۡ لَكُمۡ بَهِيۡمَةُ الۡاَنۡعَامِ "
আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জীব হালাল করেছেন।(মায়িদা ৫)
তিনি অন্যত্র বলেন,  لِّيَذۡكُرُوۡا اسۡمَ اللّٰهِ عَلٰى مَا رَزَقَهُمۡ مِّنۡۢ بَهِيۡمَةِ الۡاَنۡعَامِؕ
"আর তারা নির্দিষ্ট দিন গুলোয় চতুষ্পদ জীব হতে আল্লাহতায়ালা তাদের যে রিজিক দিয়েছেন, তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে"(সুরা হাজ্জ -৩৪)
তিনি আরো বলেন, ﴿وَمِنَ الۡاَنۡعَامِ حَمُوۡلَةً وَّفَرۡشًاؕ كُلُوۡا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللّٰهُ وَلَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّيۡطٰنِؕ اِنَّهٗ لَكُمۡ عَدُوٌّ مُّبِيۡنٌۙ﴾
" 
১৪২.) আবার তিনিই গবাদী পশুর মধ্যে এমন পশুও সৃষ্টি করেছেন, যাদের সাহায্যে যাত্রী ও ভারবহনের কাজ নেয়া হয় এবং যাদেরকে খাদ্য ও বিছানার কাজেও ব্যবহার করা হয়। খাও এ জিনিসগুলো থেকে, যা আল্লাহ‌ তোমাদের দান করেছেন এবং শয়তানের অনুসরণ করো না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সুরা আনয়াম -১৪২)
আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেন, " هَدۡيًۢا بٰلِغَ الۡكَعۡبَةِ"
"হাদিয়া কাবায় পৌছে দাও"(সুরা মায়িদাহ-৯৫)
এই থেকে জানা গেল যে,  কুরবানির যে পশু কাবায় পৌছে,  সেগূলো সে আট শ্রেণীর হয়ে থাকে।এটা হজরত আলী (রা) এর ব্যাক্ষা। আল্লাহর নৈকট্য লাভের ও তার ইবাদতের জন্যে এগুলো ব্যাবহার করা হয়।এর ধরন তিনটি, যথা,  কুরবানী, সদকা,  ও আকিকা।
হজরত(সঃ) উট ও বকরী কুরবানী দিয়েছেন। আবার উম্মুল মু'মিনিন দের পক্ষ থেকে গরু কুরবানী দিয়েছেন। এছাড়া তিনি তার বাড়ী তে উমরা ও হজ্জ্বের পশু কুরবানী করেছেন। তার রীতি এই ছিলো যে,  বকরীর গলায় মালা পড়াতেন, কিন্তু তিনি তা চিনহিত করতেন না। মুকিম অবস্থায় তিনি কো হারাম জিনিসকে হারাম করতেন না। যখন তিনি কুরবানীর জন্যে উট নিতেন, তখন তাতে মালা জড়াতেন,  চিনহ দিতেন,  ও দাগ দিতেন।তার ডান দিকের রান কিছুটা চিরে দিতেন, যা থেকে রক্ত দিতেন।
ইমাম শাফেই() বলেন, চিন্নিত করার কাজটি ডানদিকেই হয় এবং নবী (সা)  তাই করেছেন।কুরবানীর পশু যারা নিতেন।তাদের তিনি অন্য পশু না থাকলে, প্রয়োজনে তাতে সওয়ার হতে অনুমতি দিতেন।
হজরত আলী (রা)  বলেন, পশুর বাচ্চার খাওয়ার পর যে দুধ থাকে,  তা মানুষের জন্যে পান করার অনুমতি রয়েছে।নবী করীম(সা)  এর সুন্নাত এটাই ছিলো যে, উটের বাম পা বেধে, তিন পায়ের উপর দাড় করিয়ে, উট জবাই করতেন।জবাই করার সময়  তিনি বিসমিল্লাহি আলাহু আক্ববার বলতেন। কুরবানীর পশু তিনি নিজের হাতেই জবাই করতেন।অনেক সময় তিনি এই কাজ অন্যকে দিয়ে করাতেন। যেমন একবার তিনি তার একশ পশু কুরবানী করতে গিয়ে, কিছু পশুর কুরবানীর কাজ হজরত  আলী (রা) কে সোপর্দ করেছেন। যখন তিনি বকরী কুরবানি করতেন, তখন নিজের পা বকরীর উপর চেপে ধরে,  ' বিসমিল্লাহি আল্লাহু আক্ববার বলে কুরবানী করতেন।
আগেই বলা হয়েছ হজরত (সা) মিনায় কুরবানী করেছেন, মক্কার  সব জায়গাই কুরবানীর স্থল। হজরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন,  "উটের কুরবানী স্থল হল মক্কায়,  কিন্তু মক্কাকে রক্তপাত থেকে মুক্ত ও পবীত্র ঘোষনা করা হয়েছে। তবে মিনাও মক্কার অংশ। ইবনে আব্বাস (রা)  মক্কায় কুরবানী করতেন।
নবী করীম(সা) তার উম্মাতদের সদকার এবং কুরবানীর গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। এবং তা হাদিয়া ও তোহফা হিসেবে দেয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তবে তা তিন দিনের বেশি জমিয়ে রাখতে নিষেধ করেছেন। অবশ্য নিষেধের বছরটিতে মানুষ বড় অভাব অনটনে ছিলো।তার উদ্দেশ্য ছিলো,  অভাবীদের উপকার হোক।
আবু দাউদ() জুবায়ের ইবনে নুফায়ের থেকে তিনি ছওবান থেকে বর্ণনা করেন,  " রাসুল(সা) কুরবানী করলেন। তারপর বললেন,  হে ছওবান আমাদের জন্যে একটি বকরী তৈরী করে না ও।তারপর আমি মদিনায় প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত,  সেই বকরীর গোশতই খেতে দিয়েছি ।" ইমাম মুসলীম ও সেই ঘটনাটি বর্নণা করেছেন। তার ভাষ্য ছিল এই রকম,  " রাসুল (সা) বিদায় হজ্জে ছাওবান কে বলেন,  এ গোশত গুলো তৈরী করে দাও,  আমি তা ঠিক ঠাক করে দিলাম। হজরত (সা) মদিনায় ফিরে আসা পর্যন্ত তা থেকেই খাচ্ছিলেন।অনেক সময় তিনি কুরবানীর গোশত বন্টন করছেন। তারপর বলেছিলেন,  যার ইচ্ছে হয়,  বন্টন করবে অথবা নিজে নিয়ে নেবে। "
এ থেকে বিক্রির অবৈধতা বুঝা যায়,  তবে তা অস্পস্ট।

কংকর মারার পর কুরবানী

নবী করীম সা এর সুন্নাত ছিলো,  উমরার কুরবানির পশু মারওয়ার কাছে আর কিরান হজ্জ্বের পশু মিনায় জবাই করতেন। হজরত উমর (রা) ও তাই করেছেন। নবী করীম (সা) ইহরাম না ছেড়ে কুরবানী করেননি। এবং কুরবানির দিনের আগেও পশু জবাই করেননি। এমনকি কোন সাহাবাও তা করেন নি। তিনি সর্বদা সুর্যোদয়ের পর কংকর নিক্ষপ করে কুরবানী করতেন। তিনি কুরবানির দিনে চারটি কাজ করতেন। ১। কংকর মারতেন।  ২। তারপর কুরবানী করতেন। ৩। তারপর মাথা মুন্ডাতেন।  ৪।তারপর তাওয়াফ করতেন।
সুর্যোদয়ের আগে কুরবানী করা তার সুন্নাতের পরিপন্থী কাজ। তার নির্দেশ ছিল , কুরবানীর দিন এলে সুর্যোদয়ের পরই কুরবানী করতে হবে।

কুরবানী কখনও বাদ দেয়া যাবে নাঃ
হজরত (সা) দুটি ভেড়া কুরবানী করতেন।  ইদের নামাজ পড়ে তিনি তা জবাই করতেন। তিনি(সা) বলেন,  " ব্যাক্তি নামাজের আগে কুরবানী করলো,  সে কুরবানীই করল না,  সে তার পরিবার বর্গের গোশত খাওয়ার ব্যাবস্থা করলো।"
হজরত(সা)  এর সুন্নাতের এটাই তাতপর্য। ঈদের নামাজের ওয়াক্ত কিংবা খুতবার কো গুরুত্ব নেই। তবে নামাজ আদায় করতে হবে। আমরা আল্লাহর যে দ্বীনের অনুসারী তা এটাই।
হজরত (সা) বলেছেন তরুন ও তাজা দেখে ভেড়া জবাই করবে।তা দু বছরের হতে হবে।  তিনি আরো বলেন,  আইয়ামে তাশরিকের যে কোন দিন জবাই করা চলবে। অবশ্য এই হাদিস টি ছিন্ন সুত্রের। (মানে মুনকাতে হাদিস)
 গোশত  তিন দিনের বেশি জমা রাকাহ যাবে নাঃ
কুরবানীর গোশত তিন দিনের বেশি জমা রাখা যাবে না। তার অর্থ  এই নয় যে, শুধু কুরবানীর তিনদিন  জমা রাখা যাবে। বরং যেদিন জবাই হবে সে দিন থেকে তিন দিন। যদি সে ৩য় দিন জবাই করে তবে জবাইর সময় থেকে পরবর্তী তিনদিন জমা রাখতে পারবে। যারা গোশত জমা রাখার জন্যে নির্দিষ্টভাবে তিনদিনের সীমা রেখা নির্ধারণ করে, তারা কুরবানীর তিনদিনের কথাই বলেন।

কুরবানীর দিন গুলিঃ 

হজরত আলী ইবনে আবী তালীব (রা) বলেনঃ ঈদুল আজহার দিনের পরেও তিন দিন কুরবানী করা যায়। বসরা বাসীর ইমাম  হাসান () ও আ'তা ইবনে আবী রাবাহ () সিরিয়া বাসীর ইমাম আওযায়ী,  ইমাম শাফেই ()  এর মাজহাব এটাই। ইমাম মানজারের() মাসলাও তাই। যেহেতু তিনদিন মিনা,  রমী ও তাশরীফের দিন বলে নির্দিষ্ট,  তাই সে তিন দিন রোজা রাখা হারাম।  
রাসুল (সা) থেকে বর্ণিতঃসকল মিনা কুরবানীর জায়গা ও আইয়ামে তাশরীকের সব দিন পশু জবাইর দিন। জুবায়ের ইবনে মুতয়ামের এই বর্ণনা সুত্র ছিলো ছিন্ন,  তবে উসামা ইবনে যায়েদ আতা থেকে,  তিনি হজরত জাবীর (রা) থেকে এটি বর্ণনা করেন। ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান বলেন, " মদিনা বাসীর দৃষ্টি তে উসামা ইবনে যায়েদ নির্ভরশীল ও সংশয় মুক্ত বর্ণানা কারী।
দুই কুরবানীর দিন ও পরের দুই দিনঃ এ মাঝহাব  ইমাম আহমাদ ও ইমাম আবু হানীফা ()। ইমাম আহমাদ বলেন, বেশ কয়েকজন সাহাবারই মত এটা।আসরাম ইবনে উমর (রা) ও ইবনে আব্বাস (রা) থেকে অনুরুপ অভিমত ব্যাক্ত করেছেন।
কুরবানীর দিন মাত্র একটা।  এই মতটি ইবনে সিরীনের। যেহেতু ঈদুযুহা বলতে কুরবানীর দিনকেই বুঝায়।অন্যদিনকে বুঝায় না,  তাই তা অন্য দিনে হতে পারে না। যেমন ঈদুল ফিতর বলতে মাত্র একটি দিন কেই বুঝায়। সাঈদ ইবনে যুবায়ের এবং জাবীর ইববে যায়েদের বক্তব্য হল এই যে,  মিনায় তিনদিন ও অন্যত্র একদিন হবে। কারন মিনায় রমী,  হলক, তাওয়াফ ইত্যকার ইবাদত রয়েছে। তাই অন্য স্থানের মুকাবিলায় এখানে তিনদিন হওয়া উচিত। নবী করীম (সা) এর  রীতি এই যে,  কেউ যদি কুরবানীর নিয়ত করে থাকে,  এবং দশ তারিখ এসে যায়, তাহলে মাথা মুন্ডন বা এই জাতীয় কাজ করবে না।  সাহীহ মুসলীমে নবী করীম (সা) থেকে এ ব্যপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দারে কুতনি বলেন আমার কাছে সাহীহ এটাই যে,  বর্ণনা টি উম্মে সালামার উপর মওকুফ রয়েছে। নবী করীম (সা) এর সুন্নাত এটাই যে,  কুরবানীর পশু হবে উত্তম,  সুন্দর ও সর্ববিধ ত্রুটি মুক্ত। তিনি কান কাটা এবং অর্ধেক শিং ভাংগা পশু কুরবানী করতে নিষেধ করেছেন। বিশেষত মুকাবিলা বা কানের অগ্রভাগ কাটা ,  মুদাবিরা কানের পেছন ভাগ কাটা,  শুরাকা -কান ফারা বা খুরাকা -কান ছেদা পশু দিয়ে কুরবানী চলেবেনা। (আবু দাউদ)
হজরত (সা) থেকে বর্ণিত আছে যে চার ধরনের পশু দিয়ে কুরবানী চলবে না।  কানী অর্থাৎ যার ত্রুটি সুস্পষ্ট বা  বিমার বা যার রোগ প্রকাশ্য ,  লেংড়া অর্থাৎ যা সুস্পষ্ট খুড়িয়ে চলে। ভগ্ন অর্থাৎ মগজ অবশিষ্ট নেই, দুর্বল মানে অতিরিক্ত দুর্বলতার জন্যে যার চলার শক্তি রহিত হয়েছে।
এও বর্ণিত আছে যে নবী করীম (সা) মুসফারা,  মুস্তাসালা,  নুজাকা,  মাশীয়া,  ও কিসরার কুরবানী নিষিদ্ধ করেছেন। মুসফারা অর্থাৎ এতখানী কানকাটা যে সুড়ংগ দেখা যায়। যার শিং হয় নাই বললেই চলে। নুজাকা মানে যার চোখ একেবারেই অন্ধ হয়ে গেছে। মাশীয়া অর্থাৎ দুর্বলতার কারনে যা একেবারেই হালের পাছনে চলতে অক্ষম। কিসরা অর্থাৎ যার কোন অংগ ভেংগে গেছে।
ইদগায় কুরবানীঃ
আবু দাউদে হজরত জাবীর থেকে বর্নিত আছে যে,  তিনি ঈদুল আজহার দিন হজরত জাবীর( রা) এর সাথে ছিলেন।  যখন তিনি খুতবা শেষ করলেন এবং মিম্বর থেকে নামলেন এবং একটি ভেড়া নিয়ে আসা হল। তিনি সেখানে নিজ হাত্র সেটা জবাই করলেন। এবং বিসমিল্লাহি আল্লাহু আক্ববার বললেন। তারপর তিনি বললেন এ কুরবানি আমার এবং আমার যে সকল উম্মত কুরবানী দেয় নাই তাদের পক্ষ থেকে।
সহীহ দ্বয়ে বর্ণিত আছে যে,  নবী করীম (সা) ঈদগায় কুরবানীর পশু জবাই দিতেন। আবু দাউদ() বর্ণনা করেন যে,  হজরত(সা) কুরবানীর দিন দুশিং ওয়ালা দুটো খুব সুন্দর ভেড়া জবাই করেন।যখন তিনি সে দুটো শোয়ালেন, তখন এ দোয়া পড়লেনঃ


     

" নিশ্চই আমি সেই সত্তার দিকে একাগ্র চিত্তে মুখ করলাম, যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। এবং  আমি মুশরিক নই।নিশ্চই আমার সালাত,  আমার কুরবানী,  আমার জীবন ও মরণ একমাত্র বিশ্ব জাহানের রব আল্লাহর জন্যে।  তার কেউ শরীক নেই।আমাকে এই কাজেরই আদেশ করা হয়েছে, এবং আমি সবার আগে মুসলীম।হে আলাহ তোমার পশু তোমারই জন্যে , মুহাম্মদ ও তার উম্মাতের পক্ষে -আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ।
এই দোয়া পড়েই তিনি জবাই করলেন।সবাইকে বললেন পশু ঠিক ভাবে ও ভালো ভাবে জবাই কর।(অর্থাৎ ধারালো অস্রে দ্রুত ও পুরোপুরি জবাই কর)। তিনি আরো বললেন, আল্লাহ তায়ালা সব কিছুর উপরেই সদয় হওয়া অপরিহার্য করেছেন।
নবী করীম (সা) এর পবীত্র সুন্নাত ছিল এই ,  এক বকরি একজনের জন্যে ও তার পরিবারের জন্যে,  তা তাদের সংখা যতই হোক। যেমন হজরত আ'তা ইবনে ইয়াসার বলেন - আবু আইয়ুব আনসারী(রা) কে জিজ্ঞাসা করলাম যে,  নবী করীম (সা) এর সময়ে কুরবানী কিভাবে হত?
তিনি জবাব দিলেন,  কেউ যদি তার ও তার পরিবার এর তরফ হতে একটি বকরি কুরবানী দেয়, তাহলে সেও তা খাবে,  অপরকেও খাওয়াবে( তিরমিজী -হাসান সহীহ)

বুধবার, ৬ জুলাই, ২০১৬

হাফিজ ইবনুল কায়্যিম(রঃ)


আসল নাম শামসুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বকর ইবনে আইয়ুব সা'দ যরঈ দামেশকী।  তিনি বিস্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফিকাহ শাস্ত্রবিদ ছিলেন।মাজহাবের দিক থেকে তিনি ছিলেন হাম্বলী।সার্বিক বিচারে তিনি ছিলেন পুর্ণাংগ এক মুজতাহীদ।তাছাড়া ভাষা তত্ত্ব ও দর্শণ শাস্ত্রে তার পান্ডিত্ব ছিল অনন্য।
৬৯১ হিজরীতে তিনি জন্মগ্রহন করেন।বয়োঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে তিনি তকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া(রঃ) এর শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। দ্বীনি ঈলমের প্রতিটি শাখায় এমনকি সংশ্লিষ্ট বৈষয়িক বিদ্যায়ও বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করেন।ঈলমে তাফসিরে তার দক্ষতা ছিলো অতুলনীয়। হাদিস শাস্ত্রে তার অসাধারন মনীষা সর্বকালের এক বিষ্ময় হয়ে রয়েছে।ফিকাহ শাস্ত্রের সুক্ষ্ম বিশ্লেষনে তিনি ছিলেন এক বিষ্ময়কর ব্যাতিক্রম।আধ্যাত্মিক জ্ঞানেও তার গভিরতা ছিলো অপরিসীম।নিজ ধ্যান ধারনা আর আক্বীদা বিশ্বাসের দিক থেকে তিনি ছিলেন আপোষহীন এক সংগ্রামী সাধক। এই জন্যে তাকে জেল যুলুমের জাতাকলে নিষ্পেষিত হতে হয়েছে।তার চরম একত্ববাদী আক্বীদার জন্যে যথেষ্ঠ খেসারত দিতে হয়েছে।
আল্লাহর ইবাদত ও বন্দেগীতে তারভজুড়ি মেলা ভার ছিলো। সমসাময়িক কালে তার মত আবিদ এবং যাহিদ কেউ ছিলো না। তার নামাজে তন্ময়তা আর তাহাজ্জুদে একনিষ্ঠতা যে কোন  বুজুর্গের ইর্ষার বস্তু ছিল। নিষ্পাপ তাকে বলার অবকাশ নেই বটে, কিন্তু তার মত নিষ্কলুষ জীবনের অধিকারী হওয়ার সৌভাগ্য খুব কম লোকেরকই হয়েছে। কঠিনতম কষ্ঠকর মুহুর্তেও তার ভিতরে অসন্তোষের নুন্যতম ছায়াপাত হত না। তার শায়খ ইমাম ইবনে তাইমিয়া(রঃ) সাথে একই দুর্গের পৃথক কক্ষে বন্দিজীবন কাটিয়েছেন,  এবং শায়খের মৃত্যুর পরে মুক্তি লাভ করেন। এই দীর্ঘসময় তিনি কুরয়ান তিলাওয়াত এবং অধ্যয়ন ও গবেষনার কাজে লাগিয়েছেন। এরই ফলশ্রুতিতে আমরা দ্বীনি ইলমের অনেক অমূল্য সম্পদ লাভ করেছি।আল্লাহ পাক তার এই বন্দিজীবনকে তার বান্দাদের জন্যে বরকত ও কল্যানের এক অফুরন্ত ভান্ডার রুপে গরে দিয়েছেন।
তিনি জীবনে কয়েকবার হজ্জ করেন, মক্কাশরীফে অনেকদিন অবস্থান করেন। মক্কাবাসীগণ তার কাজ দেখে বিষ্মিত হতেন। বিপূল সংখ্যক লোক তার থেকে শরীয়ত  ও মারিফাতের ঈলম অর্জন করে কল্যানপ্রাপ্ত হন।তার শায়খের জীবদ্দশায়ই তিনি এই মর্জাদা লাভ করেন। শায়খের মৃত্যুর পর তার মর্জাদা আরো ব্যাপ্তি লাভ করে।মোটকথা তিনি ছিলেন তার শায়খের যোগ্য উত্তরসূরি। তার সমসাময়িক তার মত জ্ঞান ভান্ডারের অধিকারী কেউ ছিলো বলে জানা যায় না। তার রচনাবলীর ভেতর " তাহজীবে সুনানে আবু দাউদ",  " ইযাহে মুশকিলাত", " মারাহিলুস সায়িরিন", " সফরে হিজরাতাইন",  " আল কালিমুত তাইয়েব", " যাদুল মুসাফিরিন",   " যাদুল মায়াদ", উল্ল্যেখযোগ।
এছাড়াও রয়েছে নাক্বদুল মানকূল কিতাবি ইলামিল মাওকাতাইন মিন রব্বিল আ'লামিন(তিন খন্ড)। কিতাবু বা'য়দাইল ফাওয়াঈদ, আস সাওয়াইকুল মুরসালা আলাল জুহমিয়া,হাব্বিউল আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ, নুজহাতুল মুশতাকীন, কিতাবুদ দাঈ ওয়া দাওয়াই, কিতাবু মিফতাহিদ দারিস সায়াদাহ। শেষোক্তটি একটি বিশাল গ্রন্থ। তদুপরি তিনি কিতাবু তুরকিল হেকমিয়াহ, কিতাবু ইদ্দাতুস সাবিরিন,  কিতাবু আগাছাতুল লুহফান,  কিতাবু রুহ,  কিতাবু সিরাতুল মুস্তাকিম, আল ফাতহুল কুদসি, আত্ততুহফাতুল মাক্কিয়াহ,মাদারিজুস সালেকিন ইলা মানাযিলে ইয়্যাকা না" বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাইন  ইত্যাদি গ্রন্থ রচনা করেন।
এই মহান গ্রন্থকার ৭৫১ হিজরীর রজব মাসে  ইন্তিকাল করেন।বাবে সগীরের কবরস্থানে তাকে সমাধীস্থ করা হয়। তার জানাযার নামাজ পর পর কয়েক জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ইমাম ইবনে তাইমিয়্যার  শুধু শ্রেষ্ঠতম শিষ্যই ছিলেন না, ছিলেন তার স্থলাভিষিক্ত ও সকল জ্ঞানের উত্তরাধিকারী। তিনি ইমাম ইবনে তাইমিয়্যার ৩০ বছরের ছোট ছিলেন।তার জীবন কাল ছিল ৬০ বছর। তার পিতা আল মাদরাসাতুজ জাওযিয়াহর অধ্যক্ষ ছিলেন, তাই তার নামের সাথে জাওযিয়া সংযুক্ত  হল।তার শায়েখ ও উস্তাজ  ইমাম ইবনে তাইমিয়া(রঃ) এর কারনেই তিনি হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী হন।
তিনি  মূলত  ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ইলম ও মাজহাবের ধারক ও বাহক ছিলেন। তাছাড়া তিনি  তা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সেদিকেই সবাইকে ডেকেছেন। তিনি হাম্বলি মাজহাবের প্রাধান্য সৃষ্টির জন্যে পর্যালোচনা এবং সমালোচনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। ইলমুল মাওকাআইন এবং যাদুল মা'য়াদ এ ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মাজহাব কে সর্বত্র তুলে ধরার চেষ্ঠা করেছেন। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে উস্তাজের মত ছেড়ে তিনি স্বাধীন মত ব্যাক্ত করেছেন। বিভিন্ন জ্ঞানে অসাধারন পান্ডিত্বই তাকে স্বাধীন মতামতের অধিকারী করেছিল। তার সহপাঠী হাফীজ ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসীর(রঃ) বলেন,  ইবনুল কায়্যিম হাদীস শাস্ত্র আয়ত্ব করেছেন এবং জীবনের বেশির ভাগ অংশ ব্যয় করেছেন জ্ঞান চর্চায়।তিনি বিভিন্ন জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। বিশেষ করে তাফসীর আর হাদীস শাস্ত্রে তার অসাধারন গান ছিল।
তার ব্যাক্তি চরিত্র সম্পর্কে আল্লাম ইবনে কাসীর বলেন, " ইবনে কাইয়্যিম এর বহুবিধ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি বিনয়ী দৃঢ় চেতা ছিলেন। সবার সাথেই বন্ধুত্ব ছিলো,  কার সাথে শত্রুতা ছিলো না।কারো প্রতি সন্দেহ এবং পরনিন্দা থেকে তিনি ছিলেন সম্পুর্ণ মুক্ত। আমার সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব ছিলো।আমার সময়ে তার মত ইবাদাতগার কেউ ছিল না। তার নামাজ অত্যন্ত দীর্ঘ হত।  তার রুকু আর সিজদাও বেশ লম্বা হত। তা নিয়ে বন্ধুরা তাকে অনেক বিদ্রুপ করতো। তিনি তার কোন জবাব দিতেন না,   তাই বলে তিনি তার সে অভ্যাসও ছাড়তেন না "।
হাফিজ ইবনুল কায়্যিম  এর রচন ছিল অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তিনি তার শায়খের মত কঠোর সমালোচক ছিলেন না।  অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিজ মতামত তুলে ধরতেন। অবস্য জ্ঞানের গভীরতা ও  যুক্তিপ্রমানের বিশালতায় তা ভরপুর হত।তিনি সরল সহজ ও সাবলীল ভাবে নিজের বক্তব্য পেশ করতেন। তার রচনায় সর্বত্রই নিষ্ঠা আর আন্তরিকাতার ছাপ সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। মাদারিজুস সালেকিন,  ইদ্দাতুস সাবেরিন, মিফতাহ দারিস সায়াদাহ গ্রন্থে  দর্শন শাস্ত্রে তার জ্ঞানের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন।
মূলত তার রচনায় আধ্যাতিক জ্যোতি ও জ্ঞান গত দিপ্তির সংমিশ্রণ ঘটেছে।