আসল নাম শামসুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বকর ইবনে আইয়ুব সা'দ যরঈ দামেশকী। তিনি বিস্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফিকাহ শাস্ত্রবিদ ছিলেন।মাজহাবের দিক থেকে তিনি ছিলেন হাম্বলী।সার্বিক বিচারে তিনি ছিলেন পুর্ণাংগ এক মুজতাহীদ।তাছাড়া ভাষা তত্ত্ব ও দর্শণ শাস্ত্রে তার পান্ডিত্ব ছিল অনন্য।
৬৯১ হিজরীতে তিনি জন্মগ্রহন করেন।বয়োঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে তিনি তকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া(রঃ) এর শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। দ্বীনি ঈলমের প্রতিটি শাখায় এমনকি সংশ্লিষ্ট বৈষয়িক বিদ্যায়ও বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করেন।ঈলমে তাফসিরে তার দক্ষতা ছিলো অতুলনীয়। হাদিস শাস্ত্রে তার অসাধারন মনীষা সর্বকালের এক বিষ্ময় হয়ে রয়েছে।ফিকাহ শাস্ত্রের সুক্ষ্ম বিশ্লেষনে তিনি ছিলেন এক বিষ্ময়কর ব্যাতিক্রম।আধ্যাত্মিক জ্ঞানেও তার গভিরতা ছিলো অপরিসীম।নিজ ধ্যান ধারনা আর আক্বীদা বিশ্বাসের দিক থেকে তিনি ছিলেন আপোষহীন এক সংগ্রামী সাধক। এই জন্যে তাকে জেল যুলুমের জাতাকলে নিষ্পেষিত হতে হয়েছে।তার চরম একত্ববাদী আক্বীদার জন্যে যথেষ্ঠ খেসারত দিতে হয়েছে।
আল্লাহর ইবাদত ও বন্দেগীতে তারভজুড়ি মেলা ভার ছিলো। সমসাময়িক কালে তার মত আবিদ এবং যাহিদ কেউ ছিলো না। তার নামাজে তন্ময়তা আর তাহাজ্জুদে একনিষ্ঠতা যে কোন বুজুর্গের ইর্ষার বস্তু ছিল। নিষ্পাপ তাকে বলার অবকাশ নেই বটে, কিন্তু তার মত নিষ্কলুষ জীবনের অধিকারী হওয়ার সৌভাগ্য খুব কম লোকেরকই হয়েছে। কঠিনতম কষ্ঠকর মুহুর্তেও তার ভিতরে অসন্তোষের নুন্যতম ছায়াপাত হত না। তার শায়খ ইমাম ইবনে তাইমিয়া(রঃ) সাথে একই দুর্গের পৃথক কক্ষে বন্দিজীবন কাটিয়েছেন, এবং শায়খের মৃত্যুর পরে মুক্তি লাভ করেন। এই দীর্ঘসময় তিনি কুরয়ান তিলাওয়াত এবং অধ্যয়ন ও গবেষনার কাজে লাগিয়েছেন। এরই ফলশ্রুতিতে আমরা দ্বীনি ইলমের অনেক অমূল্য সম্পদ লাভ করেছি।আল্লাহ পাক তার এই বন্দিজীবনকে তার বান্দাদের জন্যে বরকত ও কল্যানের এক অফুরন্ত ভান্ডার রুপে গরে দিয়েছেন।
তিনি জীবনে কয়েকবার হজ্জ করেন, মক্কাশরীফে অনেকদিন অবস্থান করেন। মক্কাবাসীগণ তার কাজ দেখে বিষ্মিত হতেন। বিপূল সংখ্যক লোক তার থেকে শরীয়ত ও মারিফাতের ঈলম অর্জন করে কল্যানপ্রাপ্ত হন।তার শায়খের জীবদ্দশায়ই তিনি এই মর্জাদা লাভ করেন। শায়খের মৃত্যুর পর তার মর্জাদা আরো ব্যাপ্তি লাভ করে।মোটকথা তিনি ছিলেন তার শায়খের যোগ্য উত্তরসূরি। তার সমসাময়িক তার মত জ্ঞান ভান্ডারের অধিকারী কেউ ছিলো বলে জানা যায় না। তার রচনাবলীর ভেতর " তাহজীবে সুনানে আবু দাউদ", " ইযাহে মুশকিলাত", " মারাহিলুস সায়িরিন", " সফরে হিজরাতাইন", " আল কালিমুত তাইয়েব", " যাদুল মুসাফিরিন", " যাদুল মায়াদ", উল্ল্যেখযোগ।
এছাড়াও রয়েছে নাক্বদুল মানকূল কিতাবি ইলামিল মাওকাতাইন মিন রব্বিল আ'লামিন(তিন খন্ড)। কিতাবু বা'য়দাইল ফাওয়াঈদ, আস সাওয়াইকুল মুরসালা আলাল জুহমিয়া,হাব্বিউল আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ, নুজহাতুল মুশতাকীন, কিতাবুদ দাঈ ওয়া দাওয়াই, কিতাবু মিফতাহিদ দারিস সায়াদাহ। শেষোক্তটি একটি বিশাল গ্রন্থ। তদুপরি তিনি কিতাবু তুরকিল হেকমিয়াহ, কিতাবু ইদ্দাতুস সাবিরিন, কিতাবু আগাছাতুল লুহফান, কিতাবু রুহ, কিতাবু সিরাতুল মুস্তাকিম, আল ফাতহুল কুদসি, আত্ততুহফাতুল মাক্কিয়াহ,মাদারিজুস সালেকিন ইলা মানাযিলে ইয়্যাকা না" বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাইন ইত্যাদি গ্রন্থ রচনা করেন।
এই মহান গ্রন্থকার ৭৫১ হিজরীর রজব মাসে ইন্তিকাল করেন।বাবে সগীরের কবরস্থানে তাকে সমাধীস্থ করা হয়। তার জানাযার নামাজ পর পর কয়েক জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ইমাম ইবনে তাইমিয়্যার শুধু শ্রেষ্ঠতম শিষ্যই ছিলেন না, ছিলেন তার স্থলাভিষিক্ত ও সকল জ্ঞানের উত্তরাধিকারী। তিনি ইমাম ইবনে তাইমিয়্যার ৩০ বছরের ছোট ছিলেন।তার জীবন কাল ছিল ৬০ বছর। তার পিতা আল মাদরাসাতুজ জাওযিয়াহর অধ্যক্ষ ছিলেন, তাই তার নামের সাথে জাওযিয়া সংযুক্ত হল।তার শায়েখ ও উস্তাজ ইমাম ইবনে তাইমিয়া(রঃ) এর কারনেই তিনি হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী হন।
তিনি মূলত ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ইলম ও মাজহাবের ধারক ও বাহক ছিলেন। তাছাড়া তিনি তা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সেদিকেই সবাইকে ডেকেছেন। তিনি হাম্বলি মাজহাবের প্রাধান্য সৃষ্টির জন্যে পর্যালোচনা এবং সমালোচনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। ইলমুল মাওকাআইন এবং যাদুল মা'য়াদ এ ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মাজহাব কে সর্বত্র তুলে ধরার চেষ্ঠা করেছেন। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে উস্তাজের মত ছেড়ে তিনি স্বাধীন মত ব্যাক্ত করেছেন। বিভিন্ন জ্ঞানে অসাধারন পান্ডিত্বই তাকে স্বাধীন মতামতের অধিকারী করেছিল। তার সহপাঠী হাফীজ ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসীর(রঃ) বলেন, ইবনুল কায়্যিম হাদীস শাস্ত্র আয়ত্ব করেছেন এবং জীবনের বেশির ভাগ অংশ ব্যয় করেছেন জ্ঞান চর্চায়।তিনি বিভিন্ন জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। বিশেষ করে তাফসীর আর হাদীস শাস্ত্রে তার অসাধারন গান ছিল।
তার ব্যাক্তি চরিত্র সম্পর্কে আল্লাম ইবনে কাসীর বলেন, " ইবনে কাইয়্যিম এর বহুবিধ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি বিনয়ী দৃঢ় চেতা ছিলেন। সবার সাথেই বন্ধুত্ব ছিলো, কার সাথে শত্রুতা ছিলো না।কারো প্রতি সন্দেহ এবং পরনিন্দা থেকে তিনি ছিলেন সম্পুর্ণ মুক্ত। আমার সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব ছিলো।আমার সময়ে তার মত ইবাদাতগার কেউ ছিল না। তার নামাজ অত্যন্ত দীর্ঘ হত। তার রুকু আর সিজদাও বেশ লম্বা হত। তা নিয়ে বন্ধুরা তাকে অনেক বিদ্রুপ করতো। তিনি তার কোন জবাব দিতেন না, তাই বলে তিনি তার সে অভ্যাসও ছাড়তেন না "।
হাফিজ ইবনুল কায়্যিম এর রচন ছিল অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তিনি তার শায়খের মত কঠোর সমালোচক ছিলেন না। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিজ মতামত তুলে ধরতেন। অবস্য জ্ঞানের গভীরতা ও যুক্তিপ্রমানের বিশালতায় তা ভরপুর হত।তিনি সরল সহজ ও সাবলীল ভাবে নিজের বক্তব্য পেশ করতেন। তার রচনায় সর্বত্রই নিষ্ঠা আর আন্তরিকাতার ছাপ সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। মাদারিজুস সালেকিন, ইদ্দাতুস সাবেরিন, মিফতাহ দারিস সায়াদাহ গ্রন্থে দর্শন শাস্ত্রে তার জ্ঞানের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন।
মূলত তার রচনায় আধ্যাতিক জ্যোতি ও জ্ঞান গত দিপ্তির সংমিশ্রণ ঘটেছে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন